মঙ্গলবার, ৯ এপ্রিল, ২০২৪

ঈদুল ফিতরের গুরুত্ব ও তাৎপর্য : ড. মো. আবু ছালেহ পাটোয়ারী



ঈদ অর্থ খুশি, আনন্দ, এর শাব্দিক অর্থ ফিরে আসা, যেহেতু প্রতিবছর এটি ফিরে আসে মুসলিম জীবনে তাই এ দিনকে ঈদ বলা হয়। মুলত ঈদ খুশি ও আনন্দের বার্তা নিয়েই প্রতিবছর ফিরে আসে। ঈদুল ফিতর মুসলিম জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যপূর্ণ। মুসলমানদের কোন আনন্দ আল্লাহ ও তার রাসুলের নির্দেশনার বাইরে উদ্যাপন করা যায় না। যে উৎসব বা অনুষ্ঠান মানুষকে আল্লাহ হতে বিমূখ করে তা কখনও সত্যিকারের আনন্দ হতে পাওে না। মুসলমানদের জীবনে রাসূলুল্লাহ (সা:) দু’টি ঈদ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। একটি ঈদুল ফিতর, অপরটি ঈদুল আযহা। এর একটি প্রেক্ষাপটও রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা:) মদীনায় হিজরত করার পর মদীনাবাসী দেখতে পান সাওম ও খায়রাজ গোত্রের লোকেরা বছরের দুটি দিনে আনন্দ উৎসব করেছে এবং খেলাধূলা করেছে। রাসূসুল্লাহ (সা:) বললেন-এটি তোমরা কেন করছ। তারা বলল এদু’দিন আমাদের ঈদের দিন। রাসূলুল্লাহ (সা:) মুসলমানদের বললেন আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে এর পরিবর্তে দু’টি দিন আনন্দের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন, একটি ঈদুল ফিতর, আর, একটি ঈদুল আযহা। অন্য বর্ণনায় এসেছে রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন নিশ্চয়ই প্রত্যেক সম্প্রদায়ের ঈদ রয়েছে। এটি হচ্ছে আমাদের ঈদ (বুখারী মুসলিম)।

ঈদের দিন অত্যন্ত প্যুময়, এদিন ইবাদতের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে, ঈদের দিন-বিশ^ মুসলিম পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ ভূলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঈদগাহে গিয়ে ছোট বড়-ধনী-নির্ধন, আমীর-ফকির, একই কাতারে দাঁড়িয়ে এই বিশেষ ইবাদত করে থাকে। উম্মতে মুহাম্মদী (স:) কে আল্লাহ তাআলা কিছু বরকতময় অনুষ্ঠান প্রদান করেছেন। যা অন্য কোন নবী রাসূলের সম্প্রদায় লাভ করেনি। তম্মধ্যে পরস্পর ভ্রাতৃত্ব ও ভালবাসা প্রীতি ও সৌহার্দ্যরে এক অনুপম দৃষ্টান্ত প্রদর্শনের অনুষ্ঠান ঈদ। পূর্ণ একমাস আল্লাহর হুকুমে তাঁরই সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য রোযা রাখার পর ঈদের নামায পড়ার উদ্দেশ্যে মাঠে গেলে একে অপরের হাতে হাত, বুকে বুক রাখলে মুসলমান ভুলে যায় মাসের উপবাসের কষ্ট, ঈদের নামায হল সামাজিক নামায, বছরান্তে দুদিন সমাজের সর্বস্তরের মুসলিম জনতা ঈদের জামাতে সানন্দে উপস্থিত হয়। মহান আল্লাহ্র কাছে আত্মনিবেদনের পর একে অন্যের সাথে বুক মিলিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময়ের যে অনন্য সুযোগ লাভ করা যায় তার একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে ঈদের নামায। ঈদুল ফিতরের সময় সমাজের  গরীব দুঃখীকে সদাকা-ফিত্র এবং কুরবাণীর মাধ্যমে আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে যে পরিবেশের সৃষ্টি হয় তাই দুনিয়াকে বেহেস্তের বাগানে পরিণত করে। পবিত্র ঈদের দিনের অনেক ফযিলত রয়েছে। যারা দুই ঈদের নামায যথারীতি আদায় করে তাদের দু’আ কবুল করে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে অফুরন্ত পুরস্কার প্রদানে ধন্য করেন।

ঈদ উৎসবে কে কতো দামী এবং সুন্দর পোশাক পরলো বা কে কত উন্নতমানের পানাহার করলো সেটা কখনো বিচার্য নয়, বরং বিচার্য বিষয় হচ্ছে নিজ আত্মাকে কে কতটুকু নিষ্পাপ রাখতে পেরেছে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দরবারে ত্যাগ স্বীকার করে তাঁর নৈকট্য লাভে কে কতটা ধন্য হয়েছে তাই।

ঈদের দিনের মর্যাদা ও ফযীলত সম্পর্কে মহানবী (সা:) এরশাদ করেছেন: যে ব্যক্তি পুণ্য লাভের অদম্য স্পৃহায় দুই ঈদের রাতে জেগে ইবাদদ-বন্দেগীতে মশগুল থাকবে, সেদিন তার অন্তর এতটুকু ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়বে না, যে দিন অন্য সবার অন্তর ভীত সন্ত্রস্ত মৃতবৎ হয়ে পড়বে, অন্য হাদিসে উল্লেখ রয়েছে: যারা ঈদের নামায আদায় করার জন্য ঈদের ময়দানে একত্রিত হয় তাদের সম্পর্কে দয়াময় আল্লাহ তাঁর ফিরিস্তাদের জিজ্ঞেস করেন, যারা স্বেচ্ছায় দায়িত্ব পালন করে আজ এখানে সমবেত হয়েছে তাদের কি প্রতিদান দেয়া উচিৎ? ফিরিস্তারা জবাবে বলেন, তাঁদের পুণ্যময় কাজের সম্পূর্ণ পারিশ্রমিক দেয়া দরকার। তখন আল্লাহ তাআলা তাঁর ইয্যতের শপথ করে বলেন, অবশ্যই তিনি তাঁদের প্রার্থনা কবুল করবেন। এরপর আল্লাহ তাআলা ঈদের নামায সমাপনকারী তাঁর নেক বান্দাদের উদেশ্যে ঘোষণা করেন, আমি তোমাদের ক্ষমা করে দিয়েছি। আর তোমাদের কৃত অতীত পাপকে নেকীতে পরিণত করে দিয়েছি। এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা:) আরও বলেছেন: নামায সমাপনকারীরা নিষ্পাপ অবস্থায় ঈদের মাঠ থেকে স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন করে, যেন তারা নবজাতক শিশুর ন্যায় নিষ্পাপ।

ঈদুল ফিতর আরবী শব্দ। অর্থ হলো খুশি আনন্দ ও উপবাস ভঙ্গকরণ। সুদীর্ঘ একটি মাস আল্লাহ্রই নির্দেশ পালনার্থে রোযা রাখার পর বিশ^ মুসলিম এই দিনটিতে রোযা ভঙ্গ করে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসে আনন্দোৎসব করে বলে এর নামকরণ করা হয়েছে ঈদুল ফিতর।” ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করে এবং সাধ্যমত গরীব দুঃখী মানুষের একটু খাবার পশু জবায় এবং নতুন জামা কাপড়ের ব্যাবস্থা করার তাদের মুখে হাসি ফুটানোর মাধ্যমে আমরা ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারি। যেমনটি করে ছিলেন বিশ^ মানবতার মুক্তির দূত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা:)। ঈদুল ফিতরের দিন ঈদের নামাযে যাওয়ার পূর্বেই সাদাকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে । নামাযের পর আদায় করলে তা সাধারণ সাদাকায় পরিণত হবে।

বছরে ঈদের দ’দিন যে সম্মিলনের ব্যবস্থা মহান আল্লাহ করে দিয়েছেন, এর মাধ্যমেই মানুষ পারে কুরআনে নির্দেশিত  সৌহার্দপূর্ণ ও  ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণ করে কুরআনী শাসনব্যবস্থা কায়েমের পদক্ষেপ নিতে এবং সমাজের কলুষতা বিদুরীত করতে, হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে পরস্পর প্রীতির ডোরে আবব্ধ হয়ে ঈদের আনন্দের মধ্য দিয়ে শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলা উম্মতে মুহাম্মদী (সা:) এর অবশ্য কর্তব্য।

একমাস রমযানের কঠিন সিয়াম সাধনার পর আল্লাহ্তা’আলা রোযাদারকে পুরস্কারস্বরূপ একটি নির্মল বিনোদনমূলক ইবাদত ও আনন্দের মুহুর্ত প্রদান করেছেন, তা হচ্ছে ঈদুল ফিত্র বা রোযাভঙ্গের আনন্দ। মানুষ যেন ঈদের আনন্দের নামে অশালীন কিছু করে না বসে সেজন্য দিনটি দু’রাকাত ঈদের নামায আদায়ের মাধ্যমে উদ্যাপন করা ওয়াজিব করা হয়েছে। হাদিস শরীফে এসেছে, হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) হতে বর্ণিত, নবী করিম (স.) ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আযহার দিনে ঈদগাহে যেতেন এবং প্রথমেই তিনি নামাযের মাধ্যমে ঈদের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করতেন। নামায শেষ করে তিনি মুসল্লিদের উদ্দেশ্যে তাদের এক মাস সিয়াম সাধনার পর করণীয়-বর্জনীয় সম্পর্কে হিতোপদেশমূলক খুত্বা দিতেন। তিনি যদি কোন অভিযান প্রেরণের প্রয়োজন অনুভব করতেন তাহলে অভিযানও প্রেরণ করতেন। অথবা অন্যকোন নির্দেশের প্রয়োজন থাকলে তাও প্রদান করতেন। (বুখারী)

রমযানুল মুবারক ও ঈদুল ফিতরের আরেকটি ওয়াজিব ইবাদত রয়েছে, তা হচ্ছে ঈদের নামায আদায়ের পূর্বেই আর্থিক দিকে সফল ব্যক্তিগণ গরিব, মিসকিন, অসহায়, অনাথদেরকে শরিয়ত নির্ধারিত ফিত্রা প্রদান করবেন। যাতে করে তারাও ধনীদের সাথে ঈদের আনন্দে শরিক হতে পারে। ফিত্রার পরিমাণ প্রতি বৎসর ইসলামিক ফাউন্ডেশন রমযান মাসের মাঝামাঝি ঘোষণা করে থাকে। সবারই উচিত তা অনুসরণ করা। ফিত্রা সম্পর্কে হাদিস শরিফে বলা হয়েছে, হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, অহেতুক কাজ ও অশ্লীল কথাবার্তার ক্ষতি হতে রোযাকে পবিত্র করার জন্য এবং গরিব মিসকিনদের খাদ্যদ্রব্য সংস্থান করার লক্ষ্যে সাদাকাতুল ফিত্র ধনীদের উপর ওয়াজিব করা হয়েছে। যে ব্যক্তি ঈদের নামাযের পূর্বে সাদাকাতুল ফিত্র আদায় করবে সেটা হবে তার জন্য গ্রহণযোগ্য ফিত্রা প্রদান, আর যে তা ঈদের নামাযের পরে আদায় করবে তা হবে একটি নফল সাদকাহ্তুল্য। (আবু দাউদ)

আমাদের প্রত্যেকের উচিত ইসলামী শরিয়ত মোতাবেক যথাযথভাবে রমযানের সিয়াম সাধনা ও ঈদুল ফিত্র উদ্যাপনের মাধ্যমে আদর্শ সুখী ও সমৃদ্ধ সমাজ ও দেশ গঠন করা। মহান রাব্বুল আলামিন আমাদেরকে তওফিক দান করুন, আমিন।


 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বেতার বাংলা (আষাঢ়-শ্রাবণ ১৪৩১)

বেতার বাংলা (আষাঢ়-শ্রাবণ ১৪৩১)