বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

বসন্ত বন্দনা; নির্মলেন্দু গুণ

 


বসন্ত বন্দনা 

নির্মলেন্দু গুণ


হয়তো ফুটেনি ফুল রবীন্দ্র-সঙ্গীতে যতো আছে,

হয়তো গাহেনি পাখি
অন্তর উদাস করা সুরে

বনের কুসুমগুলি ঘিরে। আকাশে মেলিয়া আঁখি

তবুও ফুটেছে জবা, দূরন্ত শিমুল গাছে গাছে,

তার তলে ভালোবেসে বসে আছে বসন্তপথিক।


এলিয়ে পড়েছে হাওয়া, ত্বকে কী চঞ্চল শিহরণ,

মন যেন দুপুরের ঘূর্ণি-পাওয়া পাতা, ভালোবেসে

অনন্ত সঙ্গীত স্রোতে পাক খেয়ে মৃত্তিকার বুকে

নিমজ্জিত হতে চায়। হায় কী আনন্দ জাগানিয়া।


এমন আগ্রাসী ঋতু থেকে যতোই ফেরাই চোখ,

যতোই এড়াতে চাই তাকে দেখি সে অনতিক্রম্য।

বসন্ত কবির মতো রচে তার রম্য কাব্য খানি

নবীন পল্ববে, ফুলে ফুলে। বুঝি আমাকেও শেষে

গিলেছে এ খল-নারী আপাদমস্তক ভালোবেসে।


আমি তাই লঘুচালে বন্দিলাম স্বরূপ তাহার,

সহজ অক্ষরবৃত্তে বাঙলার বসন্ত বাহার।


 


চুনা-ওঠা দেয়ালের মতো প্রকৃতির এই খসখসে গালে

আর কী রং মাখাবে চৈত্র,

তোমার পকেটে ভাঁজ-করা শতবর্ষের শীতকাল,

মাতাল হাওয়ায় যতই এই বার্ধক্য ঢেকে দিতে চাও

তার মুখমন্ডলে জমে আছে

উত্তর গোলাধের্র অনন্ত বরফ

তার শরীর ২৫ডিগ্রি মাইনাস শীত রাত্রে;


কেনা জ্যেত্স্না, গোলাপ আর সৌরভের জন্য

হাহাকার করে

আমি কতোকাল শিশুর মতো হামাগুড়ি দিয়ে

এই শীতকাল পেরুব? গুনগুন করা চৈত্রসন্ধ্যা

মধুর দুপুর

এখনো আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে,

আমি সাড়া দেই না;

কেন দেব? আমার শীত কখন অস্ত যাবে,

কেউ জানে না।


হয়ত তবু সদ্যফোটা স্তনের গন্ধে, ঠোঁটের লাবণ্যে

জেগে উঠবে ঝিমিয়ে-পড়া দিনরাত্রি,

একুশ শতকের এই দীর্ঘ শীত পাড়ি দেওয়ার জন্য

আর কতো হিমযুগ পার হতে হবে আমাকে,

বসন্ত, তোমার হাতবাক্সে কি সেই উত্তর লেখা আছে?

চলো বসন্তের একটি বাংলা উদ্ধৃতি শোনাতে শোনাতে

আমরা পৃথিবীর সব নদী পার হই।


বৃহস্পতিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

ভাবুকটা শহীদ মিনার আঁকবে আবুল কালাম আজাদ

 



লোকটার মুখভর্তি দাড়ি। মাথায় লম্বা চুল। পরনে খদ্দরের পাঞ্জাবি আর ঢোলা পাজামা। পায়ে চটি জুতা। কাঁধে চটের ব্যাগ। কেমন ভাবুক টাইপের চেহারা। লোকটার নাম যেন কী! ধ্রুব নাকি এরকম কী যেন? শুনেছি ছবি আঁকে। কবিতাও লেখে বোধ হয়। লোকটা প্রায়ই এদিকে আসে। এসে ওই বেঞ্চিটার ওপর বসে থাকে। উদাস দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকায়। মেঘ-টেঘ দেখে। আবার সামনের মাঠটায় পুচ্চিরা খেলা করে, তা-ও দেখে। পুচ্চিরা তাকে একদম পাত্তা দেয় না। ভাবুক টাইপের মানুষদের পাত্তা না দেওয়াই ভালো। 
আজও বসে আছে সে। আগের মতোই আকাশ-টাকাশ, মেঘ-টেঘ দেখা শেষ করে তাকাল পুচ্চিদের দিকে। আজ কিন্তু পুচ্চিরা খেলা করছে না। পানিতে কাদা গুলিয়ে কী যেন করছে। পাশে আবার স্তুপ করে রেখেছে পুরনো ইট। বোধ হয় কিছু একটা বানাবে। কাদায় মাখামাখি করে পুচ্চিদের অবস্থা যা তা! মনে হচ্ছে চলমান পুচ্চি-পুচ্চি মূর্তি। 
লোকটা ডাকল - অ্যাই পুচ্চি, এদিকে আয় তো। তোর সঙ্গে কথা আছে।
একটা পুচ্চি বলল - কে, আমি আসবো?
- না, তোর পাশেরটা। যেটার বুকে, পিঠে, কপালে ঠোঁটে কাদা লেগে আছে।
কাদামাখা পুচ্চিটা এসে বলল - কী কথা বলেন!
- সামনের ঐ পাথরটায় বোস। 
- বসতে পারব না, কাজে ব্যস্ত।
 -আরে একটু বোস। শত ব্যস্ততার ফাঁকেও মাঝে মাঝে একটু বসতে হয়।
- বসেছি, এবার বলেন কী কথা। 
- তুই কয় নাম্বার শ্রেণিতে পড়িস?
- দুই নাম্বার। 
- তুই ইংরেজিতে কেমন?
- তুই তুই করে বলবেন না, তুমি করে বলেন। 
- তুই করে বলতে আমার বেশি ভাল লাগে, বুঝলি? আপন আপন মনে হয়! তুই কয় নাম্বার শ্রেণিতে পড়িস?
পুচ্চিটা বিড়বিড় করে বলল - অদ্ভূত লোক! মাত্রই বললাম আর ভুলে গেল।
- কী বললি বিড়বিড় করে?
- কিছু না। আমি দুই নাম্বার শ্রেণিতে পড়ি।
- তুই ইংরেজিতে কেমন? 
- ভালো।
- তাহলে ইংরেজি কর - আমি আমার দেশকে খুব ভালবাসি।
- আই লাভ মাই কান্ট্রি ভেরি মাচ।
- ধন্যবাদ। তুই বাংলায় কেমন?
- আরও ভালো। 
- আরেকটা ধন্যবাদ। বলতো কাল কোন মাসের কয় তারিখ? 
- ৯ ফাল্গুন, ২১ ফেব্রুয়ারি। 
- কাল কী দিবস?
- শহীদ দিবস।
 -কেন?
- ১৯৫২ সালের এই দিনে মাতৃভাষার অধিকার আদায় করতে গিয়ে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার এবং আরো অনেকে শহীদ হন। 
- কারা মেরেছিল ওদের?
- পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠি।
- পাকিস্তানি না, বল কাপুরুষ পাকিস্তানি। ওরা সাহসী বাঙালিদের ওপর বারবার নির্যাতন চালিয়েছে। ভয় পেয়ে অস্ত্র ব্যবহার করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়েছে। আচ্ছা, সেদিন কেন মেরেছিল ওদের? 
- ওরা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে মেনে না নিয়ে মাতৃভাষা বাংলার জন্য মিছিল করেছিল বলে।
- বাহ! তুই তো দেখছি অনেক কিছু জানিস। ধন্যবাদ তোকে। আচ্ছা, কাল তোরা কী করবি?
- কী করব বোঝেন না?
- না।
শহীদ মিনার বানাচিছ তাও বোঝেন না? কাল ভোরে আমরা সবাই প্রভাত ফেরিতে যাব। শহীদ মিনারে ফুল দেব। ফুলে ফুলে ঢেকে দেব শহীদ মিনার। গান গাইব - আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি.....। 
- তুই গানটা জানিস? 
- যতটুকু গাওয়া হয়, ততটুকু জানি। আমরা সবাই জানি। 
- বল তো শুনি।
- আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি .... আমার সোনার দেশের রক্তে গড়া-এ ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি...। 
- ধন্যবাদ তোকে। তোরা কোন শহীদ মিনারে ফুল দিবি? 
- আপনার মাথায় কি মগজ নেই?
- কি অদ্ভূত কথা! মগজ থাকবে না কেন? তুই জানিস আমি ছবি আঁকতে পারি? মেঘের ছবি, একটা মেঘের ওপর দিয়ে আরেকটা মেঘের উড়ে যাওয়ার ছবি। দোয়েল পাখির খাড়া লেজটা সবচেয়ে ভাল আঁকতে পারি। আর আঁকতে পারি শাপলা ফুল। লাল শাপলা, সাদা শাপলাও আঁকতে পারি। আর যা আঁকতে পারি শুনলে তুই অবাক হবি। আর পারি এক টানে রবীন্দ্রনাথ আঁকতে। একটা মাত্র টানে। মগজ না থাকলে কি এ সব আঁকা যায়? 
- কাল আমরা কোন শহীদ মিনারে ফুল দেব।
- সবাই কি সব কিছু বোঝে? রবীন্দ্রনাথই কি সব কিছু বুঝতেন? বল না, তোরা কাল কোন শহীদ মিনারে ফুল দিবি?
- আমরা যে কাদা মাখছি, এতগুলো ইট যোগাড় করেছি, তা কেন? 
- সত্যিই তো, কেন?
- আমরা শহীদ মিনার বানাচ্ছি। ইট দিয়ে মিনার বানাব। ইট বিছিয়ে বেদি বানাবো। কাদা লেপে বেদিটাকে মসৃন করবো। তিন দিকে লাল, নীল, হলুদ ফিতা টেনে দেব। ফিতার মধ্যে ঝুলিয়ে দেব অ-আÑক-খ। সামনের দিকটা খোলা থাকবে। সেদিক দিয়ে আমরা ফুল দেব। ফুলে ফুলে ভরে দেব বেদিটাকে। 
- বলিস কি! তোরা তো যেন-তেন না। তোরা সবাই একেকটা হামিদুর রহমান। অ্যাই, কাল ভোরে আমি তোদের সঙ্গে ফুল দিতে আসবো। তোদের সঙ্গে গাইব-আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি। আমার কন্ঠটা ফাটা বাঁশ হলেও সুরটা ভালোই দিতে পারি। কাল শুনলেই বুঝতে পারবি। তারপর তোদের ফুলে ঢাকা শহীদ মিনারটার একটা ছবি আঁকব। সত্যি বলছি, আমি কিন্তু মন্দ আঁকি না। শুধু মাঝেমধ্যে লাল গোলাপকে গোলাপী করে ফেলি আর গোলাপীটাকে লাল।
- ঠিক আছে, আঁকতে চাইলে আঁকবেন।
- শুধু কি ঠিক আছে? একটা ধন্যবাদ দিবি না? আমি তোকে কতগুলো ধন্যবাদ দিলাম।
- ধন্যবাদ আপনাকে। আপনে আমার অনেক সময় নষ্ট করেছেন। এতক্ষণ কত কাজ করতে পারতাম!
- আচ্ছা যা, তুই কাজ করগে। আমি একটু প্রাকটিস মানে চর্চা করি।
অদ্ভুত লোকটা আকাশের দিকে তাকিয়ে হেড়ে গলায় গাইতে লাগল-
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি
ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রু গড়া এ ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি।


বেতার বাংলা (আষাঢ়-শ্রাবণ ১৪৩১)

বেতার বাংলা (আষাঢ়-শ্রাবণ ১৪৩১)