বুধবার, ৩ জানুয়ারি, ২০২৪

বাংলাদেশ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি: কেন প্রয়োজন : সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

 




বাংলাদেশ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি: কেন প্রয়োজন

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম


বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিয়ে কিছু বলতে বা লিখতে বসলে শুরুতেই বাংলা সাহিত্যের দুই অমর ¯্রষ্টা Ñ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের শরণ নিতে হয়, যেহেতু আজ থেকে একশ বছর আগে এ বিষয়ে যে চিন্তাগুলি তাঁরা করে গেছেন, সেগুলি এখনও প্রাসঙ্গিক Ñ শুধু প্রাসঙ্গিকই নয়, সাম্প্রদায়িক নানা সংকটের মূল কারণগুলি বুঝতে, এবং সেগুলি থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজতেও সেসব সহায়ক। ১৩২৯ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ মাসে কালিদাস নাগকে লেখা এক চিঠিতে (যা ‘হিন্দুমুসলমান’ নামে বিশ^ভারতী থেকে প্রকাশিত কালান্তর গ্রন্থে ১৯৩৭ সালে প্রকাশিত) রবীন্দ্রনাথ কিছুটা হতাশার সুরে বলেন, “ভারতবর্ষের এমনি কপাল যে, এখানে হিন্দুমুসলমানের মতো দুই জাত একত্র হয়েছে Ñ ধর্মমতে হিন্দুর বাধা প্রবল নয়, আচারে প্রবল, আচারে মুসলমানের বাধা প্রবল নয়, ধর্মমতে প্রবল। এক পক্ষের যে দিকে দ্বার খোলা, অন্য পক্ষের সে দিকে দ্বার রুদ্ধ। এরা কী করে মিলবে? ” (কালান্তর, ৩১৩) মিলনের সম্ভাবনাটা, রবীন্দ্রনাথের মতে, নিজ নিজ ধর্মের বেষ্টনীতে আটকে থেকে, আচারসর্বস্বতা এবং অন্যের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। রবীন্দ্রনাথ বিশ^াস করতেন ধর্ম যেখানে মানুষের সার্বিক মঙ্গল সাধন করে, ধর্মতন্ত্র সেখানে ধর্মের নামে নানা বিপর্যয় সৃষ্টি করে। তাহলে সমাধানটা কোথায়?

রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, সমাধান “মনের পরিবর্তনে, যুগের পরিবর্তনে। য়ুরোপ সত্যসাধনা ও জ্ঞানের ব্যাপ্তির ভিতর দিয়ে যেমন করে মধ্যযুগের ভিতর দিয়ে আধুনিক যুগে এসে পৌঁছেছে, হিন্দুকে মুসলমানকেও তেমনি গন্ডির বাইরে যাত্রা করতে হবে।” চিঠিটা তিনি শেষ করেছেন এই আশাবাদ ব্যক্ত করে যে, “হিন্দুমুসলমানের মিলন যুগপরিবর্তনের অপেক্ষায় আছে। কিন্তু একথা শুনে ভয় পাবার কারণ নেই Ñ কারণ, অন্য দেশে মানুষ সাধনার দ্বারা যুগ পরিবর্তন ঘটিয়েছে, গুটির যুগ থেকে ডানা মেলার যুগে বেরিয়ে এসেছে। আমরাও মানসিক অবরোধ কেটে বেরিয়ে আসব” (কালান্তর, ৩১৩-১৪)।


অন্যদিকে নজরুল ইসলাম, যিনি দারিদ্র এবং নানাবিধ অনিশ্চয়তা, জাতপাতের সীমাবদ্ধতা এবং শিক্ষিত এলিট শ্রেণীর অবহেলার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন, জনজীবনে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উপস্থিতি এবং অভাব দুই-ই নিকট থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন, তিনিও শেষ পর্যন্ত আশার বাণীটাই শোনান। তাঁর সঞ্চিতা কাব্যগ্রন্থটির, যাতে সংকলিত কবিতা ও গানগুলি তিনি নিজে বেছে নিয়েছেন, দুটি কবিতা থেকে উদ্ধৃতি দিলে বোঝা যায়, সাম্প্রদায়িক হানাহানি দুই জাতিকে যেভাবে বিপর্যস্ত করেছিল, তা থেকে উত্তরণের একটি পথের সন্ধানে তিনি ছিলেন। পরাধীন ভারতে এই সাম্প্রদায়িক অনৈক্য দুই জাতিকেই স্বাধীনতার পথ থেকে বিচ্যুত করছিল। সর্বহারা কাব্যগ্রন্থের “কান্ডারী হুঁশিয়ার” কবিতায় তিনি লিখেন :

অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানে না সন্তরণ,

কান্ডারী! আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তিপণ।

‘হিন্দু না ওরা মুসলিম?’ ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?

কান্ডারী! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র!

                                                        (সঞ্চিতা, ঢাকা : নজরুল ইনস্টিটিউট, ২০২১, ৭৫)

এই কান্ডারী নজরুলের বিদ্রোহী, যে দুই সম্প্রদায়ের অনৈক্য ঘুচিয়ে, তাদের ভেতরের শক্তিকে একত্র করে উপনিবেশমুক্তির সাধনাকে ফলবান করতে সক্ষম।


“হিন্দু-মুসলিম যুদ্ধ” কবিতাতে (ফণি-মনসা কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত) নজরুল একদিকে বিভাজনের কথা লিখেছেন, অন্যদিকে বিভাজন দূর করা ঐক্যের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের সম্ভাবনার কথাটিও উল্লেখ করেছেন। প্রথম স্তবকের দু’টি পংক্তি :

‘খালেদ’ আবার ধরিয়াছে অসি, অর্জুন ছোড়ে বাণ।

জেগেছে ভারত, ধরিয়াছে লাঠি হিন্দু-মুসলমান!

শেষ স্তবকে এই মিলন সম্ভাবনাটি আরো তীব্র:

  যে লাঠিতে আজ টুটে গম্বুজ, পড়ে মন্দির-চূড়া,

সেই লাঠি কালি প্রভাতে করিবে শত্রু-দুর্গ গুঁড়া!

প্রভাতে হবে না ভায়ে-ভায়ে রণ,

চিনিবে শত্রু, চিনিবে স্বজন।

করুক কলহ Ñ জেগেছে তো তবু Ñ বিজয়-কেতন উড়া!

ল্যাজে তোর যদি লেগেছে আগুণ, Ñ স্বর্ণলঙ্কা পুড়া!

(সঞ্চিতা, ১২৬)

রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল দু’জনই স্বীকার করে নিয়েছেন, হিন্দুমুসলমান একত্রে পথ চলার পরিবর্তে স্বতন্ত্র পথ বেছে নিয়েছে; এই স্বাতন্ত্র্য তাদের মধ্যে কোনো সংহতি তৈরি করছে না, বরং সংকট সৃষ্টি করছে; তাদের অনৈক্য উপনিবেশি শক্তিকে তার ‘বিভাজন ও শাসন’ কৌশল প্রয়োগ করে ভারতীয়দের পরাধীনতা দীর্ঘস্থায়ী করতে সহায়তা করছে, এবং দুই সম্প্রদায়ের লোকজন পরস্পরের বিশ^াসের পবিত্র চিহ্নগুলি Ñ যেমন মন্দির ও মসজিদ Ñ ভেঙ্গে ফেলতে উদ্যত। এই অবস্থাটি তৈরি হয়েছে ধর্মের মূল বাণী ও মূল্যবোধগুলিকে বাদ দিয়ে আচার সর্বস্বতাকে গুরুত্ব দেয়ার কারণে। ঐতিহাসিকভাবে পরস্পরের দীর্ঘদিনের প্রতিবেশী, সামাজিকভাবে পরস্পরের জীবনে কোনো কোনোভাবে যুক্ত এবং অর্থনৈতিকভাবে একই নৌকার যাত্রী এ দুই সম্প্রদায় তাদের ভেতর দেয়াল তুলে দিলে শেষ পর্যন্ত কারোরই যে সিদ্ধিলাভ হবে না, তা রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুল নানাভাবে বলেছেন। তাঁদের শঙ্কা ছিল, যেভাবে এ দুই সম্প্রদায় দ্বন্দ্বমান একটা অবস্থানে চলে গেছে, তা থেকে বেরিয়ে এসে একটা ঐক্যের অবস্থানে না পৌঁছালে সংঘর্ষ এবং সংকট স্থায়ীভাবেই থেকে যাবে। রবীন্দ্রনাথ এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য মনের পরিবর্তন এবং যুগের পরিবর্তনের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন, সত্য সাধনা ও জ্ঞানের ব্যাপ্তির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন, যুগ পরিবর্তনের জন্য যে সাধনার প্রয়োজন Ñ যা জ্ঞানের, মূল্যবোধের, সাংষ্কৃতিক পরিশীলনের এবং চিদমুক্তির Ñ এই লেখায় এবং অন্যত্র সে কথাগুলি বলেছেন।


পাশাপাশি, নজরুল যে সমাধান দিয়েছিলেন তাতেও দু’টি সম্প্রদায়কে একত্র করার মতো একটি উপাদানের উল্লেখ আছে, এবং তা হচ্ছে, ইচ্ছাশক্তি, যা দুই সম্প্রদায়েরই আছে, যদিও তার প্রকাশ রুদ্ধ করেছে স্বার্থান্বেষী নানা মহল। উপনিবেশি শাসন এবং শাসকের পেশি ও পুঁজিশক্তিকে সহায়তা করে যেসব দেশীয় সহযোগী, যারা স্বজন-বিরোধী এবং স্বার্থপর, তাদের প্রতিহত করতে পারে এই শক্তি। স্বজন-বিরোধী এই শ্রেণিকে তাদের স্বার্থরক্ষার জন্য উপনিবেশিরা শুরু থেকেই ব্যবহার করেছে, এবং তাদের হেজিমনিক শাসনের বিস্তার ঘটিয়েছে। নজরুল তাঁর নানা লেখালেখিতে হিন্দু-মুসলমানের অভিন্ন শত্রু হিসেবে এদের বাইরেও দারিদ্র, ক্ষুধা এবং বৈষম্যকে চিহ্নিত করেছেন। রবীন্দ্রনাথ যেখানে জ্ঞান শক্তিকে গুরুত্ব দিয়েছেন, নজরুল দিয়েছেন ইচ্ছাশক্তি। রবীন্দ্রনাথ আবেদন রেখেছেন সত্যসাধনার কাছে, যার একটি দার্শনিক রূপ মানুষের সঙ্গে তার বহির্জগতের মিলনে পরিস্ফূট, নজরুল আবেদন রেখেছেন দুই সম্প্রদায়ের সংগ্রামী চেতনা অর্থাৎ একজন যোদ্ধার সমরে নেমে পড়ার মানসিকতার কাছে, যাকে সক্রিয়তা বা এ্যাক্টিভিজম বলে চিহ্নিত করা যায়।


দু:খের বিষয়, রবীন্দ্রনাথের জ্ঞান ও সত্যসাধনার আহ্বানে ব্যাপক কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি; নজরুলের কার্যকর ইচ্ছাশক্তির এবং সক্রিয়তার আহ্বানও অবহেলিতই রয়ে গেছে। এর ফল হয়েছে দুই প্রতিবেশির মাঝখানে এক চিরস্থায়ী দেয়াল এবং কাঁটাতারের বেড়ার আবির্ভাব। দেশভাগ নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গীগত পার্থক্যগুলির আলোচনায় না গিয়েও, এবং দেশভাগ যে অনিবার্য ছিল তা মেনে নিয়েও একটি প্রশ্ন থেকে যায়: দেশভাগজনিত হত্যাযজ্ঞ, হানাহানি, লক্ষ লক্ষ মানুষের উদ্বাস্তু হওয়া, পিতৃপুরুষের সম্পন্ন ভিটা হারিয়ে নি:স্ব হয়ে ভিনভূমিতে শরণ নেয়া, এবং দীর্ঘস্থায়ী শত্রুতার সৃষ্টি Ñ এসব কি অনিবার্য ছিল? নাকি জ্ঞান ও ইচ্ছাশক্তির বিপরীত যা, অর্থাৎ অজ্ঞানতা ও অসত্য-অর্ধসত্য, এবং ইচ্ছাশক্তির পরিবর্তে আবেগ, আর সক্রিয়তার পরিবর্তে নিস্ক্রৃয়তার কাছে এ দুই সম্প্রদায়ের আত্মসমর্পনের ফলে দেশভাগ এতটা দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত রেখে গেছে?


দেশভাগের ছিয়াত্তর বছর পর, এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার বায়ান্ন বছর পর যদি রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের হিন্দু-মুসলমান অনৈক্য এবং তা মোচনের আবশ্যকতার উপর তাঁদের গুরুত্ব আরোপকে আমরা বিবেচনায় আনি, এবং দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রদায়িকতার বর্তমান ছবিটি দেখি, তাহলে বোঝা যাবে, এই এতগুলি বছরেও না এই অঞ্চলের মানুষ জ্ঞান ও সত্যসাধানার পথে নেমেছে, না এর অবসানে তাদের ইচ্ছাশক্তি ও সক্রিয়তাকে কাজে লাগাচ্ছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও কথা ওই একই। সাম্প্রদায়িকতা কিভাবে একটি জনগোষ্ঠিকে বিপর্যস্ত করতে পারে, তার অনেক উপায় আছে। প্রথম উপায়টি বাহ্যিক সংঘর্ষের, হানাহানির, পরস্পরের উপর আক্রমনের, দ্বিতীয় একটি উপায় হচ্ছে ভাবাদর্শিক সংঘর্ষের Ñ অর্থাৎ এক ধর্মের অনুসারিদের পক্ষে নিজেদের ধর্মকে আদর্শগতভাবে উন্নত ভেবে অন্যান্য ধর্মের ভাবাদর্শগত অবস্থানকে অচ্ছ্যুত বিবেচনা করে তাদের শিক্ষা-সংস্কৃতি-ইতিহাস চর্চা-রাজনীতি ইত্যাদিকে সেই অবস্থানে ফেলে বিবেচনা করা। তৃতীয় একটি উপায় হচ্ছে প্রচার বা অপপ্রচারগত, অর্থাৎ বেতার-টিভি, পত্র-পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, মোটা দাগে মিডিয়াতে, পরস্পরের বিরুদ্ধে একটা প্রচারযুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া। চতুর্থ একটি উপায় হচ্ছে সামাজিক, অর্থাৎ নিতান্ত অভদ্র থেকে ভদ্র মানুষজনেরও তাদের সম্প্রদায়গত অবস্থান সুরক্ষিত রেখে ভিন্ন সম্প্রদায় থেকে দূরে জীবনযাপন করা। একই প্রতিষ্ঠানে, অফিসে-কারখানায় কাজ করেও, একই বাহনে চড়েও এই আলাদা হয়ে থাকাটা এখন দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলিতে এক বাস্তব সত্য। উপায় আরো আছে Ñ ঐতিহাসিক অথবা সূক্ষ্ম মনোস্ত¡াত্বিক, যেমন। ইতিহাসের কবে, সেই পাঁচশ-সাতশ-বছর আগে, কোনো এক সম্প্রদায় আরেক সম্প্রদায়ের উপর অত্যাচার করেছিল, তাদের জায়গা-জমি দখল করেছিল, তাদের মন্দির অথবা মসজিদ ভেঙ্গেছিল, তার উদ্ধৃতি দিয়ে এখন, এতদিন পর, তার বদলা নেয়ার আয়োজন যখন কোথাও হয়, বোঝা যায়, মানুষ হয়তো বাহ্যিক উন্নতিতে প্রতি বছর নতুন মাত্রা যোগ করে, কিন্তু মনের (রবীন্দ্রনাথের ভাষায় চিত্তের) সমুন্নতি একটুও হয় না। মানুষ পেছায় বরং।


অথচ, এখনও এ দুই সম্প্রদায়ের শত্রুগুলি অভিন্ন : তাদের নিয়ন্ত্রণ করা নব্য-উপনিবেশি শক্তিগুলি, সেই দারিদ্র্য, সেই অশিক্ষা, ক্ষুধা এবং বৈষম্য। শত্রুর চেহারা বদলেছে, শত্রুতা বদলায়নি। উপনিবেশী শাসকরা তাদের সেনাসামন্ত, তাদের কোম্পানির লোকজন নিয়ে সেই তেয়াত্তর এবং বায়ান্ন বছর আগে বিদায় নিয়েছে, কিন্তু তাদের জায়গায় এসেছে নব্য-উপনিবেশী অনেক শাসক। এই নব্য-উপনিবেশবাদের পরাক্রম ঘটেছে পুঁজি আর সামরিক-শিল্পপতিদের শক্তিমঞ্চের কল্যাণে, ভূ-রাজনৈতিক কূটচালের প্রাবল্যে, নব্য-উদারবাদী শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রসারে এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উপর পশ্চিমের সাঁড়াশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হওয়ার কারণে। শোষকের বিরুদ্ধে এ দুই সম্প্রদায় দাঁড়ায় না, দাঁড়ায় একে অপরের বিরুদ্ধে।


বাংলাদেশের মুসলমান আর হিন্দু চাষী দক্ষিণ এশিয়ার যে কোনো দেশের চাষীর মতোই বিপন্ন। তাদের নিয়তি তাদের হাতে নেই। অথচ সাম্প্রদায়িকতার বিষ তাদের বিপদগ্রস্ত করছে, তাদের সন্তানরাও সেই বিষে নীল হচ্ছে। তাহলে নজরুল যে কলহে লিপ্ত এ দুই সম্প্রদায়ের পক্ষে একদিন বিজয়-কেতন ওড়াবার স্বপ্ন দেখেছেন, তার কি হবে?


এই প্রশ্নটি নিয়ে ভাবা এবং এর উত্তর খোঁজা আমাদের সময়ে জরুরি, যেহেতু এখন বিশ^জুড়ে সাম্প্রদায়িকতার যে উগ্র প্রকাশ ঘটছে, যার প্রভাবে আমরা পথ হারানোর বিপদে আছি, তার তুলনা গত পঞ্চাশ-ষাট বছরে তেমন একটা দেখা যায় না। এই মুহূর্তে প্যালেস্টাইনের গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ চলছে, সারা ইউরোপে ইসলামভীতি ছড়ানো হচ্ছে । গাজার যুদ্ধের কারণে পশ্চিমে ইহুদিবিদ্বেষও বাড়ছে; পশ্চমিে উগ্র ডানপন্থীরা বর্ণবাদী ও সাম্প্রদায়িক হিংসা ছড়াচ্ছে। অর্থাৎ সারা পৃথিবীতে যেভাবে সাম্প্রদায়িকতা বাড়ছে তাতে মানবতা যে ক্রমাগত বিপন্ন হচ্ছে, তা এখন অত্যন্ত স্পষ্ট। পশ্চিমের লেখক-শিল্পী সমাজ এবং চিন্তাশীল মানুষেরা এর অবসানে সরব হচ্ছেন। পশ্চিমা মিডিয়াতেও বলা হচ্ছে, এরকম সম্প্রদায়গত সহিংসতা চলতে থাকলে শিক্ষা, অর্থনীতি, সমাজ, মানবিক সম্পর্ক Ñ সকল ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়বে, যা সারা বিশে^র জন্য ক্ষতিকর।


সাম্প্রদায়িকতার অবসান কেন জরুরি, কেন সহিংসতার পরিবর্তে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবী হয়ে দাঁড়িয়েছে, তার পক্ষে তিনটি মাত্র যুক্তিও যদি তুলে ধরতে হয়, তাহলে বলতে হবে একটি দেশের সামাজিক ভারসাম্য, গণতান্ত্রিক চেতনা, উৎপাদনশীলতা এবং গতিশীলতা থেকে নিয়ে অর্থনীতি, শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য সকল ক্ষেত্রেই সাম্প্রদায়িকতা মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে; দেশের ভেতর নানা বিভাজন-রেখা টেনে দেশটির নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলে দেয়, এবং সেই দেশের মানুষের মনের ও চিত্তের বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে তাদের অসম্পূর্ণ মানুষে রূপান্তরিত করে। বিখ্যাত ইংরেজ নাট্যকার জর্জ বার্নার্ড শ একবার বলেছিলেন, মানুষ যখন তার ধর্মের পরিচয়ে ভিন্ন ধর্মের আরেকজনকে আঘাত করে, সে পৃথিবীটাকে প্রস্তর যুগের দিকে এক পা এগিয়ে নিয়ে যায়।


আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের জীবনাচরণ বরাবরই মানবকেন্দ্রিক। দারিদ্র আর উপনিবেশি শাসনের কারণে সাম্প্রদায়িকতা এক ঐতিহাসিক সত্য বটে, কিন্তু প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের সময় ও তার পরবর্তীকালে দেশভাগের সময়ের কঠিন বাস্তবতাতেও এই মানবিকতা জাগরূক থেকেছে। যদওি সাম্প্রদায়িকতা কখনও নির্মূল হয়নি। এটি যে এখনও সক্রিয়, তার কারণ অর্থনৈতিক দারিদ্র্য নয়, বরং মানসিক দারিদ্র্য। এই সময়ে যেখানে শহরের বস্তি থেকে নিয়ে নি¤œ মধ্যবিত্ত আর মধ্যবিত্তদের এলাকাগুলিতে সকল সম্প্রদায়ের মানুষ পাশাপাশি বাস করে, তাদের শিক্ষা, কাজ ও সামাজিক মেলামেশাও এখন আর সম্প্রদায়-বিভাজিত নয়, তাহলে সাম্প্রদায়িকতা কেন থাকবে? এখন বাংলাদেশের ক্রীড়া, শিল্প-সাহিত্য, ব্যবসা-বাণিজ্য Ñ সবই তো সব সম্প্রদায়ের মানুষ যৌথভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, তাহলে কেন সাম্প্রদায়িকতা?


এর উত্তর হচ্ছে কিছু মানুষের ভেতরে ইতিহাস পরম্পরায় তৈরি হওয়া বিদ্বেষ আর অজ্ঞানতার অন্ধকার, যা আরো গাঢ় করছে প্রকৃত ও ইতহিাসভত্তিকি শিক্ষার অভাব এবং সংস্কৃতির বন্ধ্যাত্ব। সংস্কৃতি অর্থাৎ পরিশীলিত, প্রাগ্রসর চিন্তা ও জীবনদর্শন, উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী এবং মানবিক আচরণ ও বিশ^াস। আমাদের সংস্কৃতি যে শিক্ষা দিত Ñ সৌন্দর্য, চিত্তের প্রসন্নতা, সকল মানুষের মধ্যে মিল সৃষ্টি করা, জ্ঞানের আলোকে আলোকিত হওয়া। পড়াশোনার অভ্যাস এখন খুব কম পরিবারে আছে, গান-নাটক-চিত্রকলা এসব বিষয়ে আগ্রহ কমেছে, খেলাধূলার চর্চাও, বিশেষত শহরগুলিতে, মোটামুটি অনুপস্থিত। এখন দৃশ্য মাধ্যম এবং কম্পিউটার অথবা মোবাইল ফোন শিক্ষার্থীদের দিনের অনেকটা সময় ব্যস্ত রাখে। অথচ দৃশ্যমাধ্যমের ও ইন্টারনেটের ভালোটা না নিয়ে মন্দটাই বেশি নিচ্ছে বেশির ভাগ শিক্ষার্থী। এজন্য তারা জনজীবন থেকে, প্রকৃতি থেকে, একে অন্যের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন। বিচ্ছিন্ন মানুষের মনে অনায়াসে প্রভাব ফেলতে পারে অপরাজনীতি আর অপসংস্কৃতির ক্যানভাসাররা, ধর্মের নামে হিংসা বিদ্বেষ ছড়ানো স্বার্থান্বেষীরা। সাম্প্রদায়িকতা এসব কারণেই বেশ শক্তি পাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মগুলি এখন বোধ করি সাম্প্রদায়িকতা ছড়ানোতে সবার আগে।


এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায়ও যে নেই, তা নয়। তবে তা পরিশ্রমসাধ্য, এবং এর সঙ্গে জড়িত হতে হবে ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র Ñ সকল পক্ষকে।  আমার বিবেচনায় অন্তত ছয়টি বিষয়কে নির্দিষ্ট করে একটা কর্মসূচী যদি গ্রহণ করা যায় তাহলে সমস্যাটার সমাধান সম্ভবÑ এবং তার উদ্যোগ নিতে হবে জনগণের পক্ষে রাষ্ট্রকেই, যেহেতু রাষ্ট্রের পক্ষেই এর বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় জনশক্তির সমাবেশ এবং ব্যয় মেটানো সম্ভব। এ সামর্থ আজকের বাংলাদেশের আছে। প্রথমটি হচ্ছে শিক্ষা, এবং এই শিক্ষাকে হতে হবে সৃজনশীল, আধুনিক, সংস্কারমুক্ত, বিজ্ঞানমনস্ক, গণতান্ত্রিক এবং সংস্কৃতিসংযুক্ত। বর্তমানে যে শিক্ষা দেশে দেয়া হচ্ছে, যে শিক্ষা তিন-চার বা তারও বেশি ভাগে ভাগ হওয়া, তা শিক্ষার্থীদের মুখস্থ বিদ্যায় পারদর্শী করছে, তাদের বাজার ও চাকরিতে ঢোকার জন্য তৈরি করছে, কিন্তু তাদের প্রকৃত মানুষ হতে কোনো পাঠ বা অনুপ্রেরণা দিচ্ছে না। মাধ্যমিক পর্যায়ে শুরু হওয়া শিক্ষা ব্যবস্থার সম্প্রসারন এখনো প্রমানিত নয় আমাদের চলে আসা শিক্ষা অবকাঠামোতে। আর শিক্ষার ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তনের উদ্যোগ একমাত্র রাষ্ট্রই নিতে পারে। দ্বিতীয় হচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যাতে অন্তর্ভুক্ত শিক্ষক এবং আবশ্যকীয় এবং শিক্ষা সহায়ক যা যা প্রয়োজন Ñ যেমন গ্রন্থাগার, গবেষণাগার, খেলার মাঠ, মিলনায়তন, ইত্যাদি। শিক্ষকরা যদি মেধাবী হন, প্রশিক্ষিত হন, শিক্ষার্থী সচেতন হন, শিক্ষাব্রতী হন তাহলে শিক্ষা প্রকৃতই জীবন গড়ার একটা পথ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। তৃতীয় হচ্ছে পরিবার, কারণ একজন শিক্ষার্থীর মানসিকতা, রুচি মানবিকতা, জীবনঘনিষ্টতা এবং সংস্কৃতিমনস্কতা গড়তে পারে পরিবারই, পরিবারই শিশুর প্রথম পাঠশালা। চতুর্থ বিষয় হচ্ছে সমাজ, যা পশ্চাদমুখী হলে সাম্প্রদায়িকতা বাড়ে, সক্রিয় এবং সচেতন থাকলে সাম্প্রদায়িকতা পরাজিত হয়। পঞ্চম হচ্ছে দিনে দিনে শক্তিশালী হয়ে ওঠা মিডিয়া, যা যেমন পারে শিক্ষার্থীেেদর ভুল পথে টেনে আনতে, তেমনি পারে তাদের কাছে দেশ ও বিশে^র সঠিক চিত্রটি তুলে ধরতে, জ্ঞান ও মেধার বিকাশে ইতিবাচক একটি ভূমিকা পালন করতে, এবং সংস্কৃতির নান্দনিক প্রকাশগুলিতে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরতে। এবং সর্বশেষে আছে রাজনীতি, যা মানুষকে অধিকারহীন এবং পশ্চাৎমুখী করতে পারে এবং সমাজকে ধর্ম-বর্ণ-বিত্ত ইত্যাদির বিভাজনে ফেলে অস্থির করে তুলতে পারে, অথবা তার বিপরীত পথের সন্ধানও দিতে পারে। আমাদের রাজনীতিতে যদি ভালোর অবস্থান শক্তিশালী হয়, তাহলে সাম্প্রদায়িকতা ও অন্যান্য বিভেদ এবং বিদ্বেষও থাকবে না। স্বাধীন বাংলাদেশে এ চাওয়া খুব বেশি চাওয়া নয়। বস্তুত এ চাওয়াগুলো পাওয়ার জন্যই আমাদের স্বাধীন হওয়া।


সাম্প্রদায়িকতা নির্মূল করা সম্ভব নয়, তবে এর প্রকোপ কমিয়ে এনে একে দুর্বল করে ফেলা খুবই সম্ভব। এরকমটা করার আবশ্যকীয়তা এই যে, সাম্প্রদায়িকতা যতদিন সক্রিয় থাকবে, আমাদের জাগতিক উন্নয়ন হয়তো হবে, কিন্তু এই উন্নয়ন আমাদের উন্নত মানবিকতার খোঁজ দিতে পারবে না। তাহলে যে বিপর্যয় ঘটবে সমাজে, তার অভিঘাতে একদিন উন্নয়নের পথটাই পিচ্ছিল হয়ে পড়বে। জাগতিক উন্নয়ন, সেও অধরা রয়ে যাবে।  


বাংলাদেশ নামের দেশটি এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে। এর অতীত গৌরবময়। এর ভবিষ্যৎ আরো গৌরবময় হতে পারে। যদি আমরা তা চাই, তাহলে সাম্প্রদায়িকতার বিষ তাড়াতে হবে। সেটি কষ্টসাধ্য, কিন্তু অসাধ্য নয়। কঠিনের সাধনা আমরা অনেক করেছি, কঠিন সাধনার প্রত্যয় আমাদের আছে, তার সুফলও পেয়েছি। আরেকবার সেই সাধনা শুরু হলে ফল পেতে দীর্ঘসময় অপেক্ষা করতে হবে না। 



বেতার বাংলা (আষাঢ়-শ্রাবণ ১৪৩১)

বেতার বাংলা (আষাঢ়-শ্রাবণ ১৪৩১)