বেতার বাংলা, বাংলাদেশ বেতারের মুখপত্র। পূর্ব নাম এলান। বাংলাদেশ বেতারে প্রচারিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালা, বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে প্রচারিত অনুষ্ঠান ও শিল্পীদের ছবি, পান্ডুলিপি, বেতার প্রতিবেদন ইত্যাদি পত্রিকাটিতে প্রকাশিত হয়। পাশাপাশি প্রবন্ধ, নিবন্ধ, গল্প, কবিতা, ছড়া ইত্যাদিও পাশাপাশি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন কার্যক্রমভিত্তিক লেখা প্রকাশিত হয়। মূলত অনুষ্ঠানসূচি প্রকাশ করার জন্যই প্রথমে এই পত্রিকাটির প্রকাশ। পত্রিকাটিতে অনুষ্ঠানসূচির পূর্ণ বিবরণ প্রকাশিত হলে শ্রোতারা নির্ধারিত সময়ে অনুষ্ঠান শুনতে পারবেন- এই
ধারণা নিয়ে শ্রোতাদের জন্য পত্রিকাটির পথচলা শুরু হয়।
১৯৫০ খিস্টাব্দে তৎকালীন বেতার কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন অনুভব করেন একটি পত্রিকা বা মুখপত্রের। শ্রোতাগোষ্ঠীর জন্য অনুষ্ঠানসূচির পূর্ণ বিবরণ পত্রিকায় প্রকাশিত হলে নির্ধারিত সময়ে বেতারের অনুষ্ঠান শুনতে পারবেন। বস্তুতঃ শ্রোতাদের চাহিদার কথা চিন্তা করেই কর্তৃপক্ষ ১৯৫০ সালে পত্রিকাটি প্রতিষ্ঠা করেন্। তৎকালীন সময়ে নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের তাহজিব তামুদ্দুনের ভাবধারার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ১৯৫০ সালে ঢাকা থেকে বাংলায় প্রকাশিত হয় রেডিও পাকিস্তানের পাক্ষিক পত্রিকা এলান এবং উর্দু ভাষায় করাচী থেকে সাদা কালো প্রিন্টে আহং প্রকাশিত হয়। উর্দু ভাষায় আহং এর সম্পাদক ছিলেন এজাজ আহম্মদ। অন্যদিকে বাংলা ভাষায় প্রকাশিত এলানের প্রথম সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন কবি শাহাদাৎ হোসেন। তখন শুধু ঢাকাই নয় পত্রিকাটিতে পাকিস্তানের করাচী, হায়দারাবাদ, পেশোয়ারসহ অন্যান্য কেন্দ্রের অনুষ্ঠানসূচি ছাপানো হতো। পরবর্তীতে ঢাকা কেন্দ্রসহ পূর্ব পাকিস্তানে বিভিন্ন সময়ে প্রতিষ্ঠিত কেন্দ্রগুলোর অনুষ্ঠানমালা প্রকাশিত হয়। পত্রিকটিতে প্রথিতযশা ব্যক্তি বর্গের ছবি দিয়ে প্রচ্ছদ ছাপানো হতো। এছাড়া প্রখ্যাত শিল্পীদের ছবি দিয়ে ও প্রচ্ছদ ছাপানো হতো। এখানে উল্লেখ্য যে ১৯৩৯ সালে ঢাকা কেন্দ্র উদ্বোধন উপলক্ষে নিখিল ভারত বেতার বাণী: ঢাকা ধ্বনি বিস্তার কেন্দ্র এই শিরোনামে একটি স্মরণিকা ছাপানো হয়।
১৯৫০ সাল থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত এলানের সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন বিভিন্ন কর্মকর্তাবৃন্দ। ১৯৫৫ সালে পত্রিকায় সম্পাদক হিসেবে ছিলেন মোকসেদ আলাী । ১৯৫৮ সালে এ, এফ কলিমুল্লাহ ,১৯৬১ সালে শামসুল হুদা চৌধুরী এবং ১৯৬২ সালে আশরাফÑউজ Ñজামান খান প্রমুখ। এরপর দীর্ঘদিন এলানের সম্পাদক হিসেবে নাম ছাপানো হয়েছে ঢাকা কেন্দ্রের আঞ্চলিক পরিচালক সৈয়দ জিল্লুর রহমানের। পরবর্তীতে ৭১ এর ডিসেম্বর সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন হেমায়েত হোসেন ও হাসান ইমাম। ১৯৫০ সাল থেকে ১৯৭১ এই দীর্ঘ সময় এলানের সহ-সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন প্রখ্যাত ছড়া লেখক শহীদ মুহাম্মদ আখতার, সৈয়দ আমজাদ হোসেন, মীর নুরুল ইসলাম এবং ১৯৬৬ সালে ফজল-এ-খোদা। ৭১ এর পূর্বে পত্রিকাটিতে তথা এলানে সাহিত্যধর্মী লেখার গুরুত্ব দেয়া হতো না। ক্ষুদ্র পরিসরে গল্প, কবিতাকে স্থান দেয়া হতো। পরবর্তীতে পর্বভিত্তিক, দিবসভিত্তিক ও বিভিন্ন সাহিত্যিকদের লেখা ছাপানো হলে ক্রমান্বয়ে এলানের প্রকাশনা বৃদ্ধি পেতে থাকে। পাঠকমহলে জনপ্রিয়তাও লাভ করে। ১৯৫০ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত পত্রিকাটির কলেবর বৃদ্ধি পেলে শ্রোতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শরু হলে এলানের প্রকাশনা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায় ।
বেতার বাংলা পর্ব
বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পরে বেতার প্রকাশনা থেকে নতুন একটি পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বেতার কর্তৃপক্ষের প্রস্তাবিত নাম ‘বেতার বাংলা’ অনুমোদন করেন। শুরু হয় ‘বেতার বাংলা’ নামে একটি নতুন পত্রিকার পথচলা। ফেব্রুয়ারি’৭২ প্রথম পক্ষ থেকেই বেতার বাংলার সূচনা। বেতার বাংলার প্রথম বিশেষ সংখ্যাটি প্রকাশত হয় ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় পক্ষে। দিবসভিত্তিক অনুষ্ঠানসূচি প্রবন্ধ, নিবন্ধ, শিল্পীদের ছবি বেতার প্রতিবেদন ইত্যাদিসহ পত্রিকাটির পথচলা শুরু হয়। গল্প, প্রবন্ধ, নিবন্ধসহ রঙিন এ সংখ্যায় বাংলাদেশের প্রখ্যাত লেখকদের লেখা ছাপানো হয়। এদের মধ্যে আবুল ফজল, ড. নীলিমা ইব্রাহীম , ড. মযহারুল ইসলাম, শামসুর রাহমান, ড. আলাউদ্দিদ আল আজাদ, আবদুল তোয়াব খান, ড. রফিকুল ইসলাম, জিয়া হায়দার, বেলাল মোহাম্মদ, হুমায়ুন আজাদ, জুলফিকার মতিন, রাবেয়া খাতুন, রাহাত খান, সিরাজ উদ্দিন আহমেদ, টি এইচ শিকদার, রণেশ দাশগুপ্ত, ফয়েজ আহমদ, আবদুল গাফফার চৌধুরী প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। পত্রিকাটি ক্রমান্বয়ে পাঠকমহলে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে পত্রিকাটির কলেবর বৃদ্ধি পেতে থাকে। প্রথমে সাদা কালো প্রিন্টে ছাপানো হলে ও পরবর্তীতে রঙিন ক্রোড়পত্রে বেতার সংবাদ ছাপানো হয়। বর্তমানে পত্রিকাটি ৪ রঙে আর্ট পেপারে প্রকাশিত হচ্ছে। যার ফলে পত্রিকাটি পাঠক নন্দিত হয় এবং গ্রাহকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বেতার বাংলা পত্রিকাটি বর্তমানে দ্বি-মাসিক পত্রিকা হিসেবে প্রকাশিত হচ্ছে। পাঠকদের চাহিদার প্রেক্ষিতে পত্রিকাটির কলেবর ও বিষয়ভিত্তিক পর্বও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
১৯৭২ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত বেতার বাংলার সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন বেতারের বিভিন্ন কর্মকর্তা। এরা হলেন: মো. হাসান ইমাম, ফজল-এÑখোদা, মোবারক হোসেন খান, সুফিয়া খানম, এম মুহাদ্দেস, শহীদুল ইসলাম, শামসুল হুদা চৌধুরী, এটি এম মফিজুল ইসলাম, আব্দুল মালেক খান, কাজী মাহমুদুর রহমান, মাসুদুল হাসান, আবুল হায়াত মো. কামাল, এম এ জলিল, মুস্তফা আনোয়ার, শামসুল ইসলাম, মুহাম্মদ ইমাম উদ্দিন, জাহিদুল হক, সৈয়দ সাখাওয়াত জামান, আশরাফুল হক, মোস্তাফিজুর রহমান, শেখ মুহাম্মদ রেফাত আলী, নুরুজ্জামান আহমেদ, মো. তৌহিদুর রহমান, খুরশিদ আলম চৌধুরী, ফাতেমা রহমান, মো. আবদুল খালেক, ইয়াসমিনুল হুদা, মোঃ মাহফুজুল হক, জাকিয়া সুলতানা, আমানুল্লাহ মাসুদ হাসান, মোহাম্মদ ছালাহ উদ্দিন, রওনক জাহান।
বর্তমানে মর্জিনা বেগম আঞ্চলিক পরিচালক এর দায়িত্ব পালন করছেন। সম্পাদক হিসেবে আছেন মোহাম্মদ রাফিকুল হাসান এবং সহÑসম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন শারমিন আকতার জাহান ও সৈয়দ মার্গুব এলাহী। বেতার বাংলা এতদিনের পথ চলা ও পাঠকপ্রিয়তার কথা উল্লেখ করার মতো। পত্রিকাটি সরকারি হওয়ার কারণে হয়তো কোন লেখকগোষ্ঠী তৈরি করতে পারেনি, কিন্তু অনেকেই এ পত্রিকাটিতে লিখে সুনাম কুড়িয়েছেন পরিচিতি লাভ করেছেন। পত্রিকাটির সম্পাদনায় যারা দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের নিরলস পরিশ্রমের ফলে বেতার বাংলা পাঠক নন্দিত হয়েছে। স্মরণ করতে হবে পত্রিকাটির প্রচ্ছদপট ও অঙ্গসজ্জায় প্রয়াত প্রখ্যাত শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, শিল্পী হাশেম খান, রফিকুন নবী ও প্রয়াত আলোকচিত্রী লুৎফর রহমানের কথা।
সুদীর্ঘকাল বেতার বাংলা পত্রিকাটি সুধী মহলে প্রশংসিত হয়েছে। এর নেপথ্য কারিগর তারাই যারা কঠোর পরিশ্রম করে পত্রিকাটির মান উন্নয়ন করেছেন। পত্রিকাটিতে প্রকাশিত গল্প কবিতা, প্রবন্ধ, নিবন্ধ শ্রোতাদের চিঠি ইত্যাদি পাঠকদের নজর কেড়ে নেয়। সাহিত্যের ভাষা, আঙ্গিক, তথ্য প্রদানের ধরনেও রয়েছে এর বিশিষ্টতা। প্রযুক্তির প্রভাব এবং বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমের প্রসার এতটুকু ম্লান করতে পারেনি বেতার বাংলার গ্রহনযোগ্যতাকে। ভবিষ্যতে বেতার বাংলা আরো বর্ধিত কলেবরে, আরো আধুনিক আঙ্গিকে প্রকাশিত হবে। আর সে লক্ষ্য নিয়েই বেতার প্রকাশনা দপ্তরের কুশলীবৃন্দ একযোগে কাজ করে যাচ্ছে।
